নানা তৎপরতা-উদ্যোগ

বেশি ফিল্ড নিয়েও গ্যাস উৎপাদনে পিছিয়ে বাপেক্স

স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের অধীনে জরিপ, অনুসন্ধান ও কূপ খননসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার।

স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের অধীনে জরিপ, অনুসন্ধান ও কূপ খননসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিগত সরকারের নেয়া গ্যাস অনুসন্ধানসংক্রান্ত সব পদক্ষেপ এগিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু নানা তৎপরতার পরও সংস্থাটির গ্যাস ফিল্ডগুলোয় গ্যাস উৎপাদনে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। স্থানীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাপেক্সের আওতায় সর্বোচ্চসংখ্যক গ্যাস ফিল্ড থাকলেও গ্যাস উৎপাদনে সংস্থাটি সবচেয়ে পিছিয়ে। কোম্পানির আওতায় আটটি গ্যাস ফিল্ড থেকে দৈনিক ১০৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা বর্তমানের মোট গ্যাস সরবরাহের মাত্র ৫ শতাংশ।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি কোম্পানি গ্যাস উৎপাদন করছে। এর মধ্যে বাপেক্সই সবচেয়ে কম গ্যাস উত্তোলন করছে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) দৈনিক মোট গ্যাস উৎপাদন ৪৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট। কোম্পানিটির আওতায় আছে পাঁচটি গ্যাস ফিল্ড। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদন করছে তিতাস গ্যাস ফিল্ড। এ গ্যাস ফিল্ডের দৈনিক উৎপাদন ২৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট। স্থানীয় কোম্পানি হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদন করছে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল)। কোম্পানিটির আওতায় মোট পাঁচটি গ্যাস ফিল্ড থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে ১৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট।

গ্যাস উৎপাদনে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়েছে বাপেক্স। কোম্পানিটির আওতাধীন আটটি ফিল্ড থেকে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে ১০৪ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস ফিল্ডের সংখ্যা বিবেচনায় বাপেক্সের এ উৎপাদন অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বাপেক্সের আওতাধীন মোট আটটি গ্যাস ফিল্ড রয়েছে। এর মধ্যে চারটি গ্যাস ফিল্ডের দৈনিক উৎপাদন দুই মিলিয়ন ঘনফুটের কম-বেশি। সালদা নদী গ্যাস ফিল্ডের দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন ঘনফুট। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন ৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট। দ্বীপ জেলা ভোলার শাহবাজপুর গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন ৬৯ মিলিয়ন ঘনফুট। সেমুতাং গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সুন্দলপুর গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন দৈনিক দুই মিলিয়ন ঘনফুট। কুমিল্লার শ্রীকাইল গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন ১৩ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন ৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট। আর রূপগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের সক্ষমতা দৈনিক নয় মিলিয়ন ঘনফুট থাকলে ফিল্ডটি থেকে এখন কোনো গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে না।

বাপেক্সের আওতাধীন ফিল্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে ভোলার শাহবাজপুর থেকে। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত না থাকায় ভোলার স্থানীয় শিল্প-কারখানায় এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাহবাজপুর ফিল্ডের গ্যাস বাদ দিলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে বাপেক্সের অবদান যৎসামান্য। রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি হিসেবে গ্যাস সরবরাহে বাপেক্সের অবস্থান শীর্ষে থাকার কথা ছিল। কিন্তু কোম্পানিটি পিছিয়ে পড়েছে। বাপেক্সকে নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকার নানা তৎপরতা চালালেও কোম্পানিটি গ্যাস সরবরাহে পিছিয়ে পড়ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাপেক্স গঠন হয়েছিল মূলত এক্সপ্লোরেশন (অনুসন্ধান) কোম্পানি হিসেবে। পরে তারা যেসব গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার করে সেগুলো থেকে উৎপাদন শুরু করে। ফলে একপর্যায়ে তারা আর অনুসন্ধান কোম্পানি হিসেবে থেমে থাকেনি। সঙ্গে উৎপাদন কোম্পানি হিসেবেও কাজ করছে। যেহেতু তারা প্রডাকশন কোম্পানি হিসেবে কাজ করছে, ফলে তাদের আরো উৎপাদন করার সুযোগ ছিল। সেই সুযোগ তারা পেয়েছেও। কিন্তু গ্যাস উৎপাদন তারা বড় আকারে বাড়াতে পারেনি। দেশীয় কোম্পানি হিসেবে তাদের প্রডাকশন বড় আকারে বাড়ানো উচিত বলে মনে করি। এখন তাদের অর্থ দেয়া হচ্ছে। ফলে তাদের উৎপাদন খাতে জোর তৎপরতা চালানো উচিত। কারণ দেশে এখন সবচেয়ে বড় সংকট গ্যাসের। তাই গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিতে তাদের অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে।’

বিগত কয়েক বছরের গ্যাস উৎপাদনচিত্র বলছে, বাপেক্সের গ্যাস উৎপাদন আগের চেয়ে কমে আসছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাপেক্সের বার্ষিক গ্যাস উৎপাদন ছিল ৩৫ হাজার ৬১১ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন অন্তত ১৫ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট বেড়ে ৫০ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা কমে যায়। এ অর্থবছরে বাপেক্সের মোট গ্যাস উত্তোলন ছিল ৪৮ হাজার ২৭৭ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহ আরো কিছুটা কমে ৪৭ হাজার ১০৪ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। অর্থাৎ গত তিন অর্থবছরের ব্যবধানে বাপেক্সের গ্যাস সরবরাহ অন্তত তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী মো. ফজলুল হকের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বাপেক্সের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাপেক্স গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খনন কার্যক্রমে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী উত্তোলন কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। সেই কাজের তৎপরতা বিবেচনা করলে বাপেক্স অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করছে। বাপেক্সের নিজস্ব কূপগুলোর উন্নয়ন ও গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ বছরের শেষ নাগাদ বাপেক্সের গ্যাস উৎপাদন বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বাড়বে।’

দেশে স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিতে ২০২৯ সালের মধ্যে মোট ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এ পরিকল্পনায় অর্ধেকের বেশি কূপ খনন করবে বাপেক্স। এ পরিকল্পনায় বাপেক্স বিজিএফসিএল ও এসজিএফএলের পাঁচটিসহ মোট ৫৭টি কূপ খনন করবে। এর মধ্যে বাপেক্স নিজস্ব রিগ দিয়ে ৩৩টি কূপ খনন করবে। বাকি কূপ বিদেশ থেকে রিগ ভাড়া করে এনে খনন করা হবে।

আরও